ক্যাটেগরি :
 
    মেনু :
    হাত বাড়িয়ে দাও:

নূর জাহান বেগম
বয়স- ৯৫
পেশা- ভিক্ষা
ঠিকানা: মানিক মিয়ার বস্তি,
শংকর, ধানমন্ডি।

বিস্তারিত ॥ নূর জাহান বেগম একজন সাধারণ ভিক্ষুক। দুই নাতনী নিয়ে থাকেন। নিজের সম্পদ বলতে ঐটুকুই। প্রায়ই চোখে দেখেন না তিনি, হাঁটার গতি মন্থর। সারাদিনের রোজগার দিয়েই চলে তার সংসার। তার এই শেষ বয়সে তাকে কিছুটা হলেও মানসিকত শান্তি দেয়া আপনার পক্ষে অসম্ভব না। তার দিকে হাত বাড়ালে ঠকবেন না এটা নিশ্চিত জানুন।

নূর জাহান নিয়ে ফিচার তৈরী হচ্ছে। আমরা শিঘ্রই আফডেট করবো।  
 

তবু তারা বেঁচে রয় ॥
ঘাস ফড়িং ডেস্ক।

কাক ডাকা সকালে লোকজনের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গে বৃদ্ধা রহিমা বেওয়ার। দেখে একদল মানুষ চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়াচ্ছে। তাদের দেখাদেখি রহিমা বেওয়াও জোড়ে জোড়ে হাটতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে আবার শান্ত পরিবেশ। কিন্তু কি! বস্তির টিন বাঁশের খুপড়ি ঘর একটিও নেই। কোথায় গেল এতগুলো ঘর। যে ধু ধু বিরান ভূমি। বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে তাদের সব ঘর। হারিয়েছে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকুও।

আনুমানিক ৭৫ বৎসর বয়স্ক এই বৃদ্ধার তিনকূলে কেউ নেই। একসময় সবই ছিল। এখন কিছুই নেই। স্বামী ছিল, ছিল চার সন্তান (দুই মেয়ে দুই ছেলে) ফরিদপুর জেলার পদ্মার ধারে ছিল তাদের বাড়ী, ছিল বিস্তৃর্ণ জমি, গোলা ভরা ছিল ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ। রাক্ষসী পদ্মার গর্ভে বিলীন বাড়ি-ঘর, জমি-জম, আর মহাজনের পেটে গেছে অর্থ সম্পদ। বাস্তুহারা হয়ে ১৯৭১ সালে স্বামী সন্তানদের নিয়ে কাজের সন্ধানে সিলেট শহরে যান। যুদ্ধে এই বৃদ্ধার স্বামী দুই ছেলে শহীদ হন। যুদ্ধে পুরোপুরি বিধ্বস্ত দেশ। সিলেটে বিভিন্ন বাসায় কাজ করে মেয়ে দুটিকে তিলে তিলে বড় করেছে সে। একসময় সেখানেও সুবিধা করতে না পারায় ৮০-এর দশকে কাজের সন্ধানে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে দুমুঠ খাবারের আশায় আবার ঢাকায় আগমন। বিভিন্ন বাসায় বাসায় হোটেলে কাজ করে মা-মেয়েরা। এভাবেই সংসার চলছিল তাদের। হঠাৎ জন্ডিসে ছোট মেয়ে মারা যায়। বড় মেয়েকে বিয়ে দেন বস্তির এক কাঁচামাল বিক্রেতার সাথে। বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ- পুষ্টিহীনতায়, অসুখ-বিসুখ কয়েক বছর পর বড় মেয়েও মারা যায়।

হঠাৎ বুলডোজারের প্রেষণে ঘর হারিয়ে শোকে বিহবল, বাকরুদ্ধ সে। স্বামী-সন্তান হারানো এই মহিলা বস্তির দুইটি ঘর ভাড়া দিয়ে কোনরকমে খেয়ে-পড় টিকে ছিলেন। বৃদ্ধা রহিমা বেওয়া এখন একা। এখন তিনি একটি ভাঙ্গা প্লেট নিয়ে ধানমন্ডির বড় বড় অট্টালিকার গলিতে গলিতে ভিক্ষা করেন। বার্ধক্য আর বয়সের কারণে হাঁটতে তার ভীষণ কষ্ট হয়। থাকার কোন জায়গা নেই। শীতের রাতে পলিথিন আর ছেঁড়া বস্তা গায়ে দিয়ে রাস্তার উপর শুয়ে রাত কাটান। কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের জীবিকার উৎসটুকু, মাথাগোঁজার ঠাঁই। এই বৃদ্ধা যখন আমাদের জানতে চাওয়া প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন চোখের পানি গড়ে পড়ছিল তার দুগাল বেয়ে। সে এতই রোগাকান্ত ছিল যে, কাঁদতেও তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এই সীমাহীন দূর্ভোগের পরও তারা তাদের বস্তির দখল ছাড়তে রাজি নয়। আশা আছে আবার গড়বে তাদের আবাসন। বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখতে পারবে। কিন্তু কতদিন নাগাদ তা করতে পারবে কিছুই জানে না তারা। কোন সভ্য মানব সন্তান এই বৃদ্ধার চোখের পানি দেখে কি জানাতে পারবেন, কতদিনে তাদের এই চোখের পানি ঝরা বন্ধ হবে! আর কতদিন পর্যন্ত করতে হবে তাদের এই বেঁচে থাকার লড়াই!


নাম তার রাজু
লিখেছেন: সাধন কুমার ॥
তারিখ: শুক্রবার, ২৭/২/২০০৭ইং।

আমরা
রায়ের বাজার বস্তিতে গিয়ে বিভিন্ন পেশার হতদরিদ্র, অবহেলিত, বঞ্চিত শিশু, কিশোর তাদের বাবা-মা নিকট বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে জানতে চাই। তারা তাদের পরীক্ষিত জীবনের নানা প্রকার তথ্য দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করেন। এরকম এক অসহায়, সহায়-সম্বলহীন পরিবারের সন্তান রাজু ইসলাম। পানির স্রোতের মত যেমন সময় বয়ে চলে, ঠিক তেমনই সময় পরিবেশের সাথে পাল্লা দিয়ে বয়ে চলে রাজু ইসলামের জীবন। একসময় পদ্মার ধারে ছিল তাদের বসতবাড়ী জমি। পদ্মার ভাঙ্গনে জায়গা-জমিন, বাড়ী সবই বিলীন। মাত্র বৎসর বয়সে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম (অন্যের জমিতে কৃষিকাজ) রাজুর বাবা মারা যান। বৎসর বয়সী ছোট ভাই, মাস বয়সী বোন আর মাকে নিয়ে তার অভাবী সংসার। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অন্যের জায়গায় ছোট একটি টিনের ঘরে ছিল তাদের বাস। এসময় তার মা অন্যের বাড়ীতে কাজ নেন। অন্যের বাড়ীতে কাজ করে শিশুদের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেবার মত সামর্থ্যও তার মায়ের ছিল না। এই প্রতিকূল পরিবেশে সন্তানদের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেবার জন্য বুক ভরা আশা নিয়ে শহরে (ঢাকায়) তারা পাড়ি জমায়। তাদের আশ্রয় হয়ে উঠে রায়ের বাজার বস্তির একটি ঝুপড়ী ঘর। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। গ্রামের তুলনায় শহরে আয় একটু বেশি, কিন্তু ব্যয় আরও বেশি। একমুঠো অন্নের জন্য মা অন্যের বাড়ীতে কাজ নেন, আর ছোট রাজু হয়ে যায় টোকাই। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাগজ, প্লাষ্টিকের ভাঙ্গা বোতল, পলিথিন টোকায়। সেগুলো টোকানোর পর দিনশেষে বিক্রি করে আয় হয় ২০/২৫ টাকা। প্রতিমাসে বস্তির ঘর ভাড়া দিতে হয় ১০০০ টাকা। এছাড়া বস্তির মাস্তানদের জনদরদী পুলিশ ভাইদেরকে দিতে হয় প্রতি সপ্তাহে ৩০-৫০ টাকা। নোংরা ডাষ্টবিনের খাবার খেয়ে অথবা হোটেলের নানা খাবারের উচ্ছিষ্ট খেয়েইচলে তাদের সংসার। বর্ষায় পানিতে ভাঙ্গা ঝুপড়ি ঘর পুরোটা ভিজে যায়, ঘুমোতে পারে না, সারারাত জেগে বসে থাকতে হয়। আর শীতকালে হাড়কাঁপানো শীতে হাড়ে হাড়ে, দাঁতে দাঁতে বারি খায়। এভাবেই দিনের পর দিন মানবেতর দিনাতিপাত করে তারা। দিন যায় রাত আসে, সূর্য উঠে, আবার অস্ত যায়। কিন্তু রাজুদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। এখন রাজুর বয়স প্রায় ১৬ বৎসর। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে সে। আর্থিক অনটনের কারণে লেখাপড়া আর হয়নি। বস্তির পার্শ্বে একটি ভাঙ্গারী (পুরাতন টিন, লোহা, টোকানো কাগজ, প্লাষ্টিক) দোকানে কাজ করে সে। প্রতি মাসে বেতন পায় ২০০০/- টাকা। ২০০ টাকা নিজের হাত খরচ রেখে বাকী টাকা মায়ের হাতে তুলে দেয় সে।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সারাদিন দোকানে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে রাতে বাসায় ফেরে। পরদিন ঘুম থেকে উঠে আবার দোকানে। এভাবেই রাজুর দিন যায়।

তাদেরকে সাহায্যের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক, সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এন.জি. এগিয়ে এসেছে। দিয়েছে শুধু বুক ভরা আশ্বাস, স্বপ্ন আর মুখ ভরা বুলি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মীরা এসে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ঢাকা শহরের এইসব বস্তিতে অফিস তৈরী করে, তাদেরকে নানা সংগঠনের সদস্য দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা সংগ্রহ করে রাতের অন্ধকারে উধাও হয়ে যায়। আর বিনিময়ে এই সব রাজুদের পরিবারগুলো পায় ধোকা আর হতাশা, হারায় তাদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস।

তাদের জীবনে নেই কোন বিনোদন, হাসি-আনন্দ, নেই বন্ধুদের সঙ্গে<