ক্যাটেগরি :
 
    মেনু :
    হাত বাড়িয়ে দাও:

নূর জাহান বেগম
বয়স- ৯৫
পেশা- ভিক্ষা
ঠিকানা: মানিক মিয়ার বস্তি,
শংকর, ধানমন্ডি।
 

আশ্বাস ভরা করুনা নয় আর, পূর্নবাসন চাই
বিভাগ: ঘুড়ি

২২ শে জানুয়ারি বুলডোজার ভাংচুরের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে সেনপাড়া বস্তিবাসীর। আর সবার মতো খুপড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে শাহিদা দেখে তার একমাত্র চায়ের দোকানটি পিষে ফেলেছে দানব বুলডোজার। পঙ্গু স্বামী আর মেয়ে নিয়ে নিঃস্ব শাহিদার ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যায় হঠাৎ, এখন তারা যাবে কোথায়, খাবে কি?

সারাদেশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে তালিকা থেকে বাদ যায়নি কাঁচপুর ব্রিজের নিচে গড়ে ওঠা সেনপাড়া বস্তিটি। এখনকার বাসিন্দাদের দাবি, সরকার তাদের বুকে ছুরি চালিয়েছেন। তারা অবৈধ দখলদার নয় স্বাধীনতার পর ব্রিজের কাজ শুরু হলে নাম মাত্র দামে তাদের ভিটেগুলো সরকার নিয়ে নেয়, যা দিয়ে অনেকের বাড়ি করার সামর্থ্য ছিল না। তাই ব্রিজের নিচেই তারা আবাসন গড়ে তোলে। গত ৩৫ বছর এখানে তারা বাস করার পর ২২ জানুয়ারি বুঝতে পেরেছে তাদের কোনো ঠিকানা নেই। বস্তির যেসব মেয়ের ঘরে উপার্জনম পুরুষ নেই তাদের ঘর ভাঙ্গার কষ্ট পাঁজর ভাঙ্গার কষ্টের চেয়ে ভয়াবহ।

শাহিদার মতো ঘর হারিয়ে শোকে বিহবল, বাকরুদ্ধ জামিলাও। বৃদ্ধ স্বামী আর বিয়ের উপযুক্ত দুই মেয়ে নিয়ে এখানে একটি মুদি দোকান করে সংসার চালাতেন জমিলা। দুবারের দুটি ঝড় দুঃস্বপ্ন হয়ে অহিদার মধ্যে রাতের ধুম ভাঙিয়ে দেয়। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বসতভিটা গিলে খেয়েছে রাসী পদ্মা। সে রাতের দুঃস্বপ্ন আজো অহিদাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ভিটে হারিয়ে মাসিক ৩০০ টাকা ভাড়ায় স্বামী নিয়ে থাকত অহিদা কারওয়ান বাজার বস্তিতে। স্বামী বাজারে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। ১৯৯৫ সালে পেটের ব্যথায় মারা যান স্বামী। তারপরও একমাত্র মেয়ে নিয়ে জীবিকার সংগ্রামে এগিয়ে চলে অহিদা। টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত ফেরি করে চলে মা-মেয়ের সংসার। গত মাসে উচ্ছেদ অভিযান গুঁড়িয়ে দেয় অহিদার ছোট ঘরটি। বস্তিঘরের পাশেই পলিথিন টানিয়ে বসবাস করে তারা দুজন। কিন্তু মেয়ের মতোই মূল্যবান অহিদার হাঁড়ি-পাতিল আর টিফিন ক্যারিয়ারগুলো অরতি অবস্থায় চুরি হতে থাকে। অহিদার দুঃখ, এতকিছুর পরও খোঁজ নেয়নি বস্তিঘরের মালিক আড়তদার নূরুল হক। অহিদার চোখের পানি দেখে কি কোনো সভ্যজন হিসাব করতে পারবেন কয় ফোঁটা রক্তে এক ফোঁটা চোখের জল হয়?

মাহমুদা কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তিঘরের সামনে বসে পিঠা বিক্রি করত। তখন পেছনের খুপড়িটি নেই। তবে সামনের পিঠার দোকানটি রয়ে গেছে। স্বামী তার রিকশা চালাত। বছর সাতেক আগে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসে তারা। স্থানীয় জসিম মার্কেটের এক মহাজনের কাছ থেকে ঘরটি ভাড়া নেয়। তিন মেয়ে আর অসুস্থ স্বামীর মুখে আহার জোটে পিঠা বিক্রি করে। গুছিয়ে কথা বলা মাহমুদা যে ভয়ঙ্কর গোছাল কথাটি বলতে চায় তাহলো- সরকার খারাপপাড়ার মেয়েদেরও পুনর্বাসনের চিন্তু করে; কিন্তু আমাদের কথা চিন্তা করে না। খোলা আকাশের নিচে থাকা অহিদা-মাহমুদাদের এখন একটাই চিন্তা, কবে আবার দাঁড় করানো যাবে তাদের খুপড়িটি; কিন্তু কবে তা তো কেউ বলছে না!

আঞ্জুমান আরা বেগম। ৮০-এর দশকে সুখের সংসার করতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় আসেন নতুন বৌ হয়ে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার বাররা গ্রাম থেকে। ঢাকায় আসার পর লম্পট স্বামী তাদে দেহ ব্যবসার দিকে ইঙ্গিত করে। আঞ্জুমান আর ত্যাগ করেন স্বামীর সংসার। আশ্রয় নেন নীলেেতর বস্তিতে। হাতে তুলে নেন ফাক্স। সারাদিন টিএসসি এলাকায় চা চা বলে চেঁচান। গত মাসে এলাকাটির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলে পলাশীর মোড়ের একটি পাইপের ভেতর অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে যৌথভাবে বসবাস শুরু করেন। তারপরও বিড়ম্বনা, মেয়েটির চরিত্র ভালো নয়। বয়সের ব্যবধান মানে না। ওই মেয়ের সঙ্গে গভীর রাতে আঞ্জুমান আরাকেও টানাটানি করে লম্পটের দল। আঞ্জুমান আরা জানতে চান- কোথায় আছে তার জন্য একটি সুরতি আবাসন।

কামরাঙ্গীর চরের বস্তি এই নিয়ে উচ্ছেদ করা হলো ১০ বার। তারপরও রোজিনা আর নাজমারাও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আশায় বুক বাধে। নিজেদের জন্য না হোক সন্তানের জন্য বেঁচে থাকতে হবে তো!

বেড়ার ফোকরে কোনোমতে ঠাঁই নিয়েছেন রোজিনা বেগম। যে কোনো সময় জ্বালিয়ে দেওয়া হবে, নয়তো ভেঙে ফেলা হবে মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও। কোথায় যাবেন, আর কি করবেন, কিছুই ভেবে পান না তিনি। গত দিন ধরে স্বামীর অনুপস্থিতি তার উপর উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহারা হওয়া; সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে ধরেছে অসহায়ত্বের জাল। বছরের বাচ্চাটাকে রেখে যে কাজে যাবেন সে উপায়ও নেই।

আমাদের কি থাকার জায়গা আছে? কত কষ্ট করি। আগে কাজ করতাম। এখন বাচ্চা পালুম না কাম করুম। বাচ্চা লইয়া তো আর কাম করা যায় না। ইনকাম ছাড়া ঘর পামু কই? আর কম দামের ঘরও না\ দুর্দশার কথা বলতে বলতে কান্নায় ভিজে উঠে রোজিনার চোখ। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শূন্য দৃষ্টি মেলে বসে থাকা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। রোজিনা অভিযোগ করেন, সাহায্যের জন্য পর্যন্ত কেউই আসেনি। তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তারও কোনো প্রতিবাদ নেই। চার বছরের মেয়ে আর মাজে নিয়ে টেনেটুনে চলছিল নাজমার সংসার। স্বপ্নেও ভাবেনি ক্রেন এসে নিমিষেই ভেঙ্গে দিয়ে যাবে সব। জিনিসপত্র সরানোর সময়টুকুও পায়নি। লুটপাট হয়ে গেছে অধিকাংশই। এখন এক গ্লাস পানি যে খাবে সেই গ্লাসটাও নেই। এমন অবস্থায় তার কাজে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। নাজমা হতবিহবল দৃষ্টিতে তাকায় আর বলে, কাজ করি। সপ্তাহে ৩০০ টাকা পাই; কিন্তু এখন তো যাইতে পারি না। কেমনে যামু। মা রমজান বিবি আপে করে বলেন, আগুনে পুড়লে কত রকম সাহায্য পাওয়া যায়; কিন্তু এখন সরকার কোনো সাহায্যই করব না।

ওরা যাবে কোথায়?
অবৈধ
জায়গার সূত্র ধরে বস্তি উচ্ছেদ করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গরিব মানুষগুলোই। রোজিনা, নাজমা আর রমজান বিবিরা দখলদার ছিল না। ওরা কেবল ভাড়া দিয়ে এখানে থাকত। ওরা সুবিধাভোগী দখলদারদের সম্পদ বানানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আজ ওরা সর্বস্ব হারিয়েছে। কিন্তু মূল দখলদাররা থেকে যাচ্ছে আড়ালেই। ফলে ওরা হারিয়েছে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু। একদিকে ঘর ছাড়ার কষ্ট, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের অমানবিক আচরণ। এত বিপদেও কোনো সাহায্য আসেনি। বাড়িয়ে দেয়নি কেউ সহযোগিতার হাত। তাদের সবারই অভিযোগ, সাহায্যের জন্য কেউ আসে ন&